রনি ইমরান, পাবনাঃ পূর্ব দিকে যমুনা, পশ্চিমে জংশন। উত্তরের অপরূপ প্রকৃতি, দক্ষিণে নীল পদ্মা, চকচকে জলরাশির পাবনা জেলার ১৯৮ তম জন্মদিন আজ। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর সরকারের ৩১২৪ নম্বর স্মারকে পাবনাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, পাবনা নামটি ‘পদুম্বা’ থেকে এসেছে, যা কালক্রমে স্বরসঙ্গতির পরিবর্তনে ‘পাবনা’ হয়েছে। পাবনা জেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৯০ সাল অবধি বর্তমান পাবনার বেশীরভাগ অংশ রাজশাহী জেলার একটি থানা হিসাবে ছিল। জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট এ ডাব্লিউ মিল্সকে ১৮২৮ সালে পাবনায় জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ১৮৩২ সালে জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেটের পরিবর্তে ডেপুটি কালেক্টর নিয়োগের মাধ্যমে পাবনা পায় পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা। কোম্পানি শাসনের অবসানের পর ১৮৫৮ সালে বৃটিশ সম্রাজ্ঞী রাণি ভিক্টোরিয়ার শাসনাধীনে চলে যায় পাবনা জেলা। এর আগে ১৮৫৫ সালে ময়মনসিংহ জেলা থেকে সিরাজগঞ্জ থানাকে পৃথক করে পাবনা জেলার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি এ জেলায় প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। প্রথম মোটর সার্ভিসের প্রবর্তন করা হয় ১৯২৬ সালে। ১৯৪০ সালের পর পাবনা শহরে রিকশার প্রচলন ঘটে।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে পাবনা জেলার রয়েছে অনন্য ভূমিকা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার মানুষের বীরত্বপূর্ণ অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বিশ্ববরেণ্য কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিল্প উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, অভিনেতা-অভিনেত্রী পাবনা তথা গোটা দেশকে বিশ্ব দরবারে স্বগৌরবে তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ স্থাপত্যের টেকসই নিদর্শন দেশের একমাত্র বৃহত্তর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু এবং দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও অবস্থিত পাবনায়। ২০০৮ সাল থেকে পাবনা জেলার জন্মদিন পালনের সূচনা করেন ক্রিয়েটিভ আলোকচিত্রশিল্পী খালেদ হোসেন পরাগ।
পাবনায় রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান। জেলার হেমায়েতপুরে অবস্থিত দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতাল এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের জন্মভূমি। নদীমাতৃক এই জেলার বুকে বয়ে চলেছে পদ্মা, যমুনা, ইছামতি, আত্রাই, বড়াল, কাগেশ্বরী, গুড়া, গুমানি ও চিকনাই নদীসহ বহু রূপবতী নদী। হোসিয়ারি, তাঁত, কাঁচি, বেনারসি-কাতানসহ নানান শিল্পে সমৃদ্ধ এই জেলা একসময় ছিল দেশের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র। বর্তমানে পাবনা জেলার প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম। ২,৩৭১.৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলা ৯ টি উপজেলা ও ৭৩ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, পাবনার মোট জনসংখ্যা ২৯,০৯,৬২৪ জন। আর দুই বছর পর দুইশত বছরে পা দেবে পাবনা জেলা। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের আশায় বুক বেঁধে আছে পাবনাবাসী।
পাবনা শহরের বাসিন্দা ডা. রাম দুলাল ভৌমিক বলেন, প্রাচীন শিল্প সাহিত্যের জেলা পাবনায় মানুষের ভাগ্যর উন্নয়ন হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। অসহনীয় যানজট নানা জনভোগান্তিকর সমস্যার দ্রুত সমাধান চাই।
ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ, ইছামতি নদী খনন, বিনোদন পার্ক নির্মাণ, পাবনা পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা এবং দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সঙ্গে পাবনা জেলার সংযুক্তি প্রাণের দাবিগুলো পাবনার জনমানুষের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে।
পাবনার সিনিয়র সাংবাদিক উৎপল মির্জা বলেন, দুইশত বছরের জেলা পাবনায় প্রত্যশিত উন্নয়ন হয়নি। একসময় জেলায় সমৃদ্ধ হোসিয়ারি, তাঁত, বেনারসি শিল্পের বিকাশ হয়নি। আমরা আরো পেছনে গেছি, পাবনায় নতুন করে অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন তৈরি হয়নি । একজন কবি বন্দে আলী মিয়া তৈরি হয়নি।
আগের মত চলনবিলের মাছ, চলনবিলের শস্য নেই। আমাদের হতাশা বাড়ছেই।
পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বিশু বলেন, পাবনা আমাদের সকলের প্রাণের ঠিকানা। এই জেলার মানুষের উন্নয়ন হলে তাদের ভালো রাখতে পারলেই আমাদের আনন্দ। আমারা মানুষের উন্নয়নে জন্য কাজ করছি।
পাবনার বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস অবহেলিত পাবনাবাসীর প্রত্যাশিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন । এরই লক্ষ্যে পাবনায় আইসিটি হাই-টেক পার্ক, নতুন শিল্প নগরী, ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা-পাকশী ও পাবনা-সুজানগর সড়ক প্রশস্তকরণ, ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিশেষায়িত হাসপাতাল, পদ্মার বুকে পাবনাকে সংযুক্ত করে ওয়াই-আকৃতির সেতু নির্মাণ, রাজবাড়ী পাবনা অঞ্চলে পদ্মা নদীতে ব্যারেজ নির্মান। পাবনার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন। ১০০ বছরের লক্ষ্য নিয়ে পৌরসভার মাস্টার প্ল্যানের উদ্যোগগুলো অবহেলিত এই জেলায় আশার আলো দেখাচ্ছে।
.jpg)
